সিলেট ভ্রমণ। পর্ব – ১ (জাফলং, মায়াবতী ঝর্না)

বিছানাকান্দি, সিলেট।

2016-08-26_060212

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত জনপদ সিলেট। এমনিতেই জাফলং, জৈন্তিয়া পাহাড়, ভোলাগঞ্জের সারি সারি পাথরের স্তুপ, বিছানাকান্দি ছাড়াও হযরত শাহজালাল ও শাহপরানের মাজার সিলেটকে করেছে সৌন্দর্য ও ইতিহাসমন্ডিত।

এই লেখাটি সিলেটের জাফলং ও তার নিকটবর্তী মায়াবতী ঝর্ণা, খাসিয়াপল্লী, বিছানাকান্দি ও তার আশেপাশের ঝর্ণা সমূহ নিয়ে সাজানো হয়েছে। আজকের পর্ব- ১ঃ জাফলং ও মায়াবতী ঝর্ণা।

প্রথমেই যাতায়াতঃ

বাসে বা ট্রেনে ঢাকা থেকে যেতে পারেন। যারা অল্প বাজেট ও সময়ের মধ্যে ভ্রমণ  উপভোগ করতে চান তাদের জন্য সবচেয়ে ভালো যাতায়াতের মাধ্যম হতে পারে রেলপথ। মঙ্গলবার বাদের সবদিনই রাত ৯টা৫০ মিনিটে উপবন এক্সপ্রেস ঢাকার কমলাপুর থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ভাড়া হতে পারে ১৫০ থেকে ৮০০ পর্যন্ত। চাইলে আপনি ক্যান্টনমেন্ট বা এয়ারপোর্ট রেলবন্দর থেকেও চড়তে পারেন আর এই ট্রেন সিলেট শহরে পৌঁছাবে ভোর ৫-৬ টার মধ্যে। আর এছাড়াও রাত ১২টা৩০ পর্যন্ত ঢাকা থেকে বাসযোগে সিলেট যেতে পারেন ইউনিক, হানিফ, শ্যামলী, সোহাগ, গ্রীন লাইন পরিবহনে। ভাড়া হতে পারে ৪০০ থেকে ৯০০ পর্যন্ত (এসি সহ বা ব্যতীত)।

ছবিঃ সিলেট রেলস্টেশন।

2016-08-26_060551

সিলেট রেলস্টেশন

থাকবেন যেখানেঃ

ঘোরাঘুরি যেহেতু মূল উদ্দেশ্য, থাকাটা খুব বেশী গুরত্বপূর্ণ ধরা হয়না। চাইলে আপনারা এখানে কম খরচে হোটেল ব্যবস্থা করে নিতে পারেন তাতে টূরে অন্যন্য খরচে সহায়ক হতে পারে। এক্ষেত্রে অনুরোধ থাকবে শাহজালাল মাজারের আশেপাশেই কোথাও থাকার হোটেলের ব্যবস্থা করে নেবার জন্য তাতে আপনাদের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণে সুবিধা হবে। তাছাড়া ফাইভস্টার হোটেলগুলোর কথা বলতে গেলে ফরচুন গার্ডেন, হোটেল ডালাস, হোটেল রোজভিউ অন্যতম। আর সাধ্যের মধ্যে চাইলে হোটেল হিল টাউন, গুলশান, দরগা গেইট, সুরমা ছাড়াও মাজারের আশে পাশে একটু ভিতরের দিকে কিছু হোটেল পাবেন মৌলিক সুবিধাদি সহকারে স্বল্প খরচের মধ্যেই।

এবারে স্থান দর্শন এবং প্রথমেই জাফলংঃ

মূলত প্রকৃতি কন্যা হিসেবে পরিচিত জাফলং।  বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার অন্তর্গত, একটি এলাকা। জাফলং, সিলেট শহর থেকে ৬২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত, এবং এখানে পাহাড় আর নদীর অপূর্ব সম্মিলন বলে এই এলাকা বাংলাদেশের অন্যতম একটি পর্যটনস্থল হিসেবে পরিচিত।বাংলাদেশের সিলেটের সীমান্তবর্তি এলাকায় জাফলং অবস্থিত। এর অপর পাশে ভারতের ডাওকি অঞ্চল। ডাওকি অঞ্চলের পাহাড় থেকে ডাওকি নদী এই জাফলং দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। মূলত পিয়াইন নদীর অববাহিকায় জাফলং অবস্থিত। সিলেট জেলার জাফলং-তামাবিল-লালখান অঞ্চলে রয়েছে পাহাড়ী উত্তলভঙ্গ। এই উত্তলভঙ্গে পাললিক শিলা প্রকটিত হয়ে আছে, তাই ওখানে বেশ কয়েকবার ভূতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। সিলেটনগরী থেকে ৬২ কিলোমিটার উত্তর পূর্ব দিকে গোয়াইনঘাট উপজেলায় জাফলং এর অবস্থান। (সূত্রঃ উইকিঃ https://bn.wikipedia.org/wiki/জাফলং)

এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো, যদি দুদিনের সফর হয়ে থাকে এবং জাফলং ও বিছানাকান্দি ভ্রমনের উদ্দেশ্য থাকে তাহলে অবশ্যই অনুরোধ করবো আগে জাফলং যাবার জন্য এবং এর পাশের মায়াবতি ঝর্ণা ভ্রমণের জন্য।

বলে রাখা ভালো, ভ্রমণে যতো বেশীজন মিলে যাবেন, খরচ ততটাই কমে আসবে। সিলেট শহর থেকে আপনি অনেকভাবেই জাফলং যেতে পারেন, সিএনজি/টেম্পু/বাস/মাইক্রোবাসে করে। সময় লাগতে পারে ২ থেকে ২.৩০ ঘন্টা। আর ভাড়া সিএনজির(৪-৫ জন) ক্ষেত্রে হতে পারে ১০০০ থেকে ২০০০ টাকা (দামাদামি করে নিতে হবে) আর অটো টেম্পুর ( ১০-১২ জন কমপক্ষে)
ক্ষেত্রে ভাড়া ২০০০ থেকে ৩০০০ হতে পারে। তবে অবশ্যই ভালোভাবে বুঝিয়ে বলবেন নইলে ভাড়া নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে পারেন।

জাফলং এর অনিন্দ্য সৌন্দর্য নিয়ে বলার ভাষা নেই। এককথায় অসাধারন। যদিও শহর থেকে জাফলং যেতে যেতে আপনি দেখতে থাকবেন আর জেনেও যাবেন যে দূর থেকে দেখা বৃহৎ তিনটি ঝর্ণাই পড়েছে ভারতের সীমানায়। জাফলং পৌঁছে কিছুদূর হাঁটতে হবে এবং অনেকটা পাহাড়ের নীচে নেমে যেতে যেতে পানির অংশটুকু ও বাংলাদেশ-ভারতের সীমানাস্থল জিরো পয়েন্টে পৌছাবেন। শীত মৌসুমে এর চেহারা সম্পূর্ণই ভিন্ন, তবে বৃষ্টি বা তার পরবর্তি সময়টাই জাফলং এর সৌন্দর্য ফুটে উঠে।

ছবিতেঃ জাফলং ঘেঁষে শ্রীরামপুর গ্রাম যেখানে মনিপুরীদের বসবাস।

2016-08-26_061254

শ্রীরামপুর গ্রাম।

এখানে আসার পরপরই অনেকেই আসবে গাইড হবার জন্য তবে মূল বিষয় হচ্ছে এখানে ভ্রমণের জন্য গাইডের প্রয়োজন নেই। আপনি নিজেই পাহাড় বেয়ে নিচের দিকে নামলেই ছোট ছোট হ্রদ আর স্বচ্ছ পানির সাথে রংবেরঙ্গের পাথরের সারি দেখতে পাবেন যা আপনাকে শুধু মুগ্ধই করবে না, একই সাথে ভুলিয়ে দিবে আপনার ব্যস্ততা, দুশ্চিন্তা, ক্লান্তি।

ছবিতেঃ পাহাড় থেকে নেমে পানির স্রোত আর ছোট ছোট হ্রদের খেলায় জাফলং। 

2016-08-28_041632

পাহাড় থেকে নীচে নেমেই জিরো পয়েন্ট।

জাফলং এ জিরো পয়েন্টে এসে আপনি পাবেন এক অন্যরকম তৃপ্তি। একপাশে যেমন ভারতীয়রা তাদের সীমানা সৌন্দর্যকে উপভোগ করছেন অন্যদিকে আমরা বাংলাদেশীরাও আমাদের সীমানার মধ্যে জাফলং-এর সৌন্দর্য আর পানির স্রোত নিয়ে অপার তৃপ্তিতে মজে উঠেছেন। এ যেনো সীমানা আমাদের দুভাগে ভাগ করলেও আনন্দ আর উপভোগে নেই বাধা, সীমা-পরিসীমা।

জাফলং-এর কিছু ছবিঃ 

ছবিতেঃ স্বচ্ছ পানির মধ্যে নানা রঙের পাথর। 

2016-08-28_044235

সারি সারি গোছানো পাথরের সাথে হাটুসমান পানি।

বিকেলটা এখানে না কাটিয়ে গেলেই নয়। 

2016-08-28_044648

অপলক দৃষ্টি শুধু চেয়ে রয়।

একদিকে পানি আর পাথরের সারি তো অন্যদিকে পাহাড় আর মেঘের লুকোচুরি। 

2016-08-28_044917

দূরে ভারতে অবস্থিত পাহার আর বামে খাসিয়াপল্লী।

ছবিতেঃ সন্ধ্যার জাফলং। 

Jaflong Waterside

Jaflong Waterside

বলে রাখা ভালো, বিকেলটা পারলে এখানেই কাটাবেন। এজন্য প্রথমে খাসিয়াপল্লী আর মায়াবতী ঝর্ণা হয়ে আবার এখানে আসতে পারেন। আর জাফলং জিরো পয়েন্টে খাবারের একটা ছোট দোকান আছে (দোকান বললে ভুল হবে, অনেকটা তাবুর মতো করে বানানো)  আর ভারতীয় পণ্য পাবেন বিশেষত সাবান ও চকলেট এবং বেশ সুলভ মূল্যে। যতদূর দেখেছি, সাবার বেশ ভালো বিক্রি হয়। দুপুরের মধ্যে এখান থেকে ঠিক পশ্চিমে সোজা চলে যাবেন মায়াবতী ঝর্ণায় আর জিরো পয়েন্ট থেকে সেখানে হেঁটে পৌছাতে সময় লাগবে প্রায় ১৫ থেকে ২৫ মিনিট। অনেকে নৌকা নিয়ে যান, অনুরোধ থাকবে হেঁটেই যাবার নয়তো আবারো ঠকতে পারেন।

মায়াবতী ঝর্ণাঃ 

ঝর্ণা বলতে যারা শুধু বান্দরবানের বড় বড় ঝর্ণাগুলোই বুঝে থাকেন তারা বর্ষা বা শেষের দিকে এই ঝর্ণা দেখলে খানিকটা বিষ্মিতই হবেন। কারন বেশ বড় এই ঝর্ণাটি খুব বেশী পরিচিত বা সমাদৃত নয়। আর যারা ঝর্ণা খুব একটা সামনে থেকে দেখেননি তারা এটাকে বেশ বড় আর বিস্তৃত মনে করবেন আর সেটা মনে করাই স্বাভাবিক। এক দেখাতে ঝর্ণাটি অসাধারন আর এতোটাই ছন্দের সাথে তিনটি রাস্তা দিয়ে অনেকটা সমপরিমানে প্রবাহিত হচ্ছিল যে চোখে দেখে শেষ করার মতো নয়। আর ঝর্ণার সুমধুর শব্দ অনুভব করতে গেলে যেনো হারিয়ে যাবেন এক গহীন কোন স্রোতের ধারার মাঝে…… এক কথায় অবর্ণনীয়।

ছবিতেঃ ঝর্ণার একাংশ। 

2016-08-28_050233

ঝর্ণার একপাশ।

ঝর্ণার সম্মুখভাগ।

ছবিঃ পানির বেগ আর পরিমান এতো মাত্রাই ছিলো যে নিজেকে আপনি বাধ্য করবেন এই জলরাশিতে হারিয়ে যেতে। 

DCIM299MEDIA

সারি সারি পানির ধারা।

বারবার শুধু একথাই বলবো, এখানে না আসলে বলে বোঝানো অসম্ভব যে কতটা স্মরণীয় এই অভিজ্ঞতা। (ছবিতে আমরা) 

DCIM299MEDIA

ঝর্ণার মাঝামাঝি স্তরে আমরা।

সবকিছু দেখার পর এটুকু বলবো সিলেট আসলে অবশ্যই প্রথম দিনের প্ল্যানে জাফলং, মায়াবতী ঝর্ণা আর বিকেলটা আবারো জাফলং এ খেয়ে যেতে পারেন আর দৃশ্যটা উপভোগ করবেন। অবশ্যই মধুর একটি অভিজ্ঞতা নিয়ে যাবেন। যদিও কিছুটা আক্ষেপ থাকতে পারে কারন ভারতীয় সীমানায় পর্যটনকে যথেষ্ট উন্নত করা হয়েছে অন্যদিকে আমাদের এদিকে তা বেশ অবহেলিত বলাই যায়। হয়তো আমাদের এদিকে উন্নত করা হলে আরো বেশী সুন্দর ও মনোরম লাগতো বলে আমার বিশ্বাস।

আজ এটুকুই, পরবর্তী পর্বে আলোচনা হবে খাসিয়াপল্লী, ক্বীন ব্রীজ, বিছানাকান্দি, পান্থুমাই ঝর্ণা ও তার আশপাশের দৃশ্য। ধন্যবাদ।

Leave a comment

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *