বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়ক রাজ রাজ্জাক আর নেই

বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক আব্দুর রাজ্জাক যিনি নায়ক রাজ রাজ্জাক নামে পরিচিত গতকাল ২১ আগস্ট ২০১৭, আনুমানিক সন্ধ্যা ৬.১৩ মিনিটে রাজধানী ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। বিকেলের দিকে নিজ বাসভবনে হঠাৎ অসুস্থ্যবোধ করায় তাকে সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। কর্তব্যরত ডাক্তাররা তাকে দেখার পর মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের বিদায় হল যা বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি বলে অভহিত করেছেন তার সমসাময়িক অভিনেতা, অভিনেত্রীগণ এবং চলচ্চিত্রের সংশ্লিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ।

নায়ক রাজ রাজ্জাক

নায়ক রাজ রাজ্জাক ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি টালিগঞ্জ, কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। নিজের জন্মস্থান কলকাতায় সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় মঞ্চ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে তার অভিনয় জীবন শুরু করেন এবং ১৯৬৬ সালে জহির রায়হানের বেহুলা চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশী চলচ্চিত্রে তার অভিষেক ঘটে। বাংলা চলচ্চিত্র পত্রিকা চিত্রালীর সম্পাদক আহমদ জামান চৌধুরী তাকে নায়করাজ উপাধি দিয়েছিলেন। অভিনয়জীবনে তিনি বেহুলা, আগুন নিয়ে খেলা, এতটুকু আশা, নীল আকাশের নীচে, জীবন থেকে নেয়া, ওরা ১১ জন, অবুঝ মন, রংবাজ, আলোর মিছিল, অশিক্ষিত, ছুটির ঘণ্টা এবং বড় ভালো লোক ছিলসহ মোট ৩০০টি বাংলা ও উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন।

রাজ্জাক চলচ্চিত্র পরিচালনায়ও সফলতা অর্জন করেন। তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র অনন্ত প্রেম ১৯৭৭ সালে মুক্তি পায়। তার পরিচালিত সর্বশেষ চলচ্চিত্র আয়না কাহিনী মুক্তি পায় ২০১৪ সালে।তিনি সব মিলিয়ে প্রায় ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। তার পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে অনন্ত প্রেম, অভিযান, জ্বিনের বাদশা, বাবা কেন চাকর, আমি বাঁচতে চাই, কোটি টাকার ফকির, মন দিয়েছি তোমাকে এবং আয়না কাহিনী।

নায়ক রাজ্জাক এবং কবরী ছিলেন অনেক জনপ্রিয় একটি জুটি। দর্পচূর্ণ, রংবাজ, নীল আকাশের নিচে ছবিগুলো ছিল তাদের জুটির অন্যতম জনপ্রিয় ছবি।

নায়ক রাজ্জাক নায়িকা কবরী সারোয়ার সাথে জুটি বেধে অনেকগুলো হিট ছবি দর্শকদের দিয়েছিলেন; তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হচ্ছে, ‘দর্পচূর্ণ,’ ‘রংবাজ’, ‘নীল আকাশের নিচে’। কবরী ছাড়াও তিনি সুচন্দা, ববিতা, শাবানা, সুচরিতা, রোজিনা, নুতনসহ আরো অনেক নায়িকাদের সাথে চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। নায়ক রাজ রাজ্জাক মূলত নায়িকা শাবানা, ববিতা এবং কবরীর সাথে বেশি অভিনয় করেন।

রাজ্জাক এবং শাবানা অভিনীত ছবি ‘মাটির ঘর’ মুক্তি পায় ১৯৭৯ সালে

পরিচালক আজিজুর রহমান তার ‘মাটির ঘর’ ছবিতে নায়ক রাজ্জাক এবং শাবানার জুটিটাকে একটা আলাদা জায়গা করে দিয়েছিলেন। এই জুটির আরেকটি পুরস্কার প্রাপ্ত ছবি ‘ছুটির ঘণ্টা’। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার সংস্কৃতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। ১৯৭৬, ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৮৪ ও ১৯৮৮ সালে তিনি মোট পাঁচবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করা হয়। এছাড়াও তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য বাচসাস পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। 

বাংলা চলচ্চিত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়ক রাজ রাজ্জাক ২০১৭ সালের ২১শে আগস্ট সন্ধ্যা ৬:১৩ মিনিটে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপতালে ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

Leave a comment

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *