মিতালীর গল্প

মিতালী বাবা মায়ের এক মাত্র মেয়ে। শহরের কিনারা ঘেঁষে ছোট্ট একটি গলিতে তাদের তিন তলা বাড়ি। বাবা পেশায় ব্যবসায়ী  আর মা পুরদস্তর গৃহিণী। মিতালী জন্মের পর থেকেই এই ইটের দালানে মানুষ। এমনিতে হাসিখুশি আর বেশ চঞ্চলা মেয়ে  মিতালী। নামের সাথে মিল রেখেই যেন সবার সাথে তার সখ্যতা। কি স্কুলের মামা, বা ঝালমুড়িওয়ালা বা পাড়ায় ফেরি করতে আসা বুড়ো লোকটা সবার সাথেই তার ভালো সম্পর্ক।আর তাই তো বাবা-মার বড় আদরের মেয়ে মিতালী। আর আদরের সন্তান দেখেই হয়ত তার উপর নিষেধাজ্ঞার অন্ত নেই।


তার এই ছোট্ট জীবনের দুই- তৃতীয়াংশ সময় ইট কাঠের দেয়ালে আর বাকি সময় স্কুলের গণ্ডীতে সীমাবদ্ধ। শহরের কোথায় কি আছে তা বইয়ের পাতা উল্টিয়ে আর ছবি দেখে জানলেও নিজ চোখে সেসব দেখার সৌভাগ্য তার নেই বললেই চলে। বন্ধু- বান্ধবদের সাথে কোথাও যাওয়ার ইচ্ছাগুলো তার কখনই পরিপূর্ণতা পায় না। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে হয়ত সারা বছরে ২/১ বার বিশেষ অনুমতি পাওয়া যায় কিন্তু তাতে খাজনার চেয়ে বাজনাই বেশী। ছুটির দিনে বা গ্রীষ্মের লম্বা ছুটিতে তাকে এই চার দেয়ালেই কাটিয়ে দিতে হয়। কখনও জানালার পাশে বসে পথিকের আশা যাওয়া বা গুনগুন করে  চেনা সুর ভাজা বা নিজের ঘরে বসে শুয়ে বসে থাকা ছাড়া তার করার তেমন কিছু নেই। কদাচিৎ হয়ত গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। আর  ২/৩ বন্ধু-বান্ধব যাদের সাথে কথা হয় তাদের সহানুভূতি জাগানো কথাগুলো যেন কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতই।

পড়াশুনায়  অসম্ভব রকমের ভালো দেখে  শিক্ষকরা মিতালীকে বরাবরই বাইরে যেতে উৎসাহ দেয়। কিন্তু সে জানে বাইরে  তাকে কখনই দেয়া হবে না। এই কথা মুখে নেয়াই তার জন্য যেন বিশাল এক অপরাধ। মুখ ফুটে এই কথা বলার সাহস তার কখনই হবে না। ঈদগুলো তার বরাবরই পানসে মনে হয়। সুন্দর সুন্দর সব জামা কাপড় পেলেও সেইসব পরে সেজেগুজে ঘরেই কাটিয়ে দিতে হয় তার। সেবার সামান্য পিকনিকে যাওয়ার ইচ্ছাটাও তার পূরণ হল না। টিফিন পিরিয়ডে সবার মুখে পিকনিকের  মজার গল্পগুলো হাসি মুখে শুনতে হয়।


এ কিন্তু তার হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা কষ্টগুলো কেউই দেখতে পায় না। কেউই বুঝতে পায় না তার চোখেমুখে খেলা করতে থাকা নানা  রঙের স্বপ্নগুলো। সে জানে তার এই শখগুলো তার বাবা- মা পূরণ করবে না। তার বাবা- মা যে তাকে অনেক ভালবাসে সে ব্যাপারে তার কোন অভিযোগ নেই।  কিন্তু তাদের একটাই কথা, “মেয়ে হলে অনেক কিছুই মেনে নিয়ে তাকে সমাজে চলতে হবে”। তাকে অপেক্ষা করতে হবে তার রাজপুত্রের জন্য। যে তার সব আশা পূরণ করবে। তখন বাবা মার শাসনে আর বন্দি হয়ে থাকতে হবে না। আসলেই কি তাই? সে যাই হোক। এই সত্য মেনেই তাকে বড় হতে হবে হবে।  এমনি অনেক মিতালী শহরের নানা জায়গায় তাদের স্বপ্নগুলো খাঁচায় বন্দী রেখে গুনগুণ করে চার দেয়ালে কাটিয়ে দেয় শৈশব কৈশোরের দিনগুলো।

 “আমি একা রইলাম ঘাটে
ভানু সে বসিলো পাটে।
তোমা বিনে ঘোর সংকটে
না দেখি উপায়…”

Leave a comment

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *